(বাংলাভাষায় অহিংস যোগাযোগ বা ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন নিয়ে গুগলে সাধারণ কোন লেখা খুঁজে পাইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাউফুন নাহারের মনের যত্ন বইটি পড়তে গিয়ে ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাই। তারপরে সাধারণ পাঠকদের জন্য এই লেখাটি তৈরি করার কাজ শুরু করি। নিজে প্রথম পড়েছি, তারপরে কিছুটা বুঝেছি বা চেষ্টা করে বিষয়টা লিখছি। আর পরবর্তীতে লালন গবেষক ফ্রান্সের নাগরিক দেবোরা কিউকারম্যানকে এনভিসি সম্পর্কে জানাতে গিয়ে লেখাটি লিখেছি। চেষ্টা করবো, এই পোস্টে এনভিসির তত্ত্ব, ব্যবহার ও বিভিন্ন টুলস সম্পর্কে লিখতে)

অহিংস যোগাযোগ বা ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন কী?

অহিংস যোগাযোগ বা ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন (সংক্ষেপে এনভিসি, যাকে সমবেদনামূলক যোগাযোগ বা সহযোগী যোগাযোগও বলা হয়) মার্শাল রোজেনবার্গ উনিশ শতকের ষাটে দশকের শুরুতে অহিংস জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি হিসেবে শুরু করেন। [1] [2] [3]

এনভিসি তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বাস করে, সমস্ত মানুষই সহানুভূতি গুণ সমৃদ্ধ। সবারই সহানুভূতির ক্ষমতা রয়েছে। মানুষের যখন সমাজ বা অন্যের কাছ থেকে প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য তেমন কোন কার্যকর উপায় থাকে না তখনই তারা হিংসাত্মক আচরণ বা সহিংসতা বেছে নেয়। [1]

এনভিসি তত্ত্ব অনুসারে, সব মানুষের আচরণ নির্ভর করে সর্বজনীন মানবিক চাহিদা পূরণের প্রয়াসের ওপর। এমন চাহিদার কারণে সমস্যা তৈরি হয় না, বরং প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হলেই তখন বিরোধ দেখা দেয়। এনভিসি তত্ত্ব অনুসারে, সব মানুষের তার চাহিদা বা প্রয়োজনকে বুঝতে হবে। প্রয়োজনের কারণ নিয়ে চিন্তা ও অনুভূতিকে ভিত্তি করে চাহিদা ও প্রয়োজনকে বুঝতে হবে। কি কি প্রয়োজন তা জানার পরে তা অর্জনের জন্য কৌশলগুলি বিকাশ করতে হবে। সবশেষে, পরস্পরের চাহিদা পূরণের জন্য একে অপরকে সহযোগিতা করতে হবে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতি ও ভবিষ্যতের জন্য সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে সম্পর্কে জানা। [1]

এনভিসির লক্ষ্য হচ্ছে তিনটি বিষয়কে সংযুক্ত করা। সরল অর্থে, ব্যক্তি নিজের মধ্যে, অন্যের মধ্যে এবং সবশেষে গোষ্ঠী ও সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাজ করে এনভিসি। এনভিসি ব্যক্তি হিসেবে মানুষকে যোগাযোগের কৌশল বা প্রক্রিয়া শেখায় যার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতি বা মমত্ব পূর্ণ সংযোগ স্থাপন করা যায় ও তা জোরালো করা যায়। এই ধারণার অনুসারীরা অহিংস যোগাযোগের ইতিবাচক বিষয় হিসেবে নির্দিষ্ট মূল্যবোধসমূহ নিয়ে চর্চার সুযোগকে গুরুত্ব দেন। ইতিবাচক দিক হিসেবে আধ্যাত্মিক মানবিকতার অনুশীলন, পিতামাতার দায়িত্বের অংশ, সামাজিক পরিবর্তনের একটি মাধ্যম, সংঘাতে মধ্যস্থতার মাধ্যম, বিশেষ ধরণের শিক্ষাদান ও বিশ্ব-দর্শন হিসাবে এই তত্ত্বের গুরুত্ব আছে।

প্রয়োগ

অহিংস যোগাযোগ তত্ত্বের সাংগঠনিক ও ব্যবসার দিকে প্রয়োগ করা হয়। [1] [2] এছাড়াও প্যারেন্টিংয়ে, [3] [4] [5] শিক্ষায়, [6] [7] [8] [9] মধ্যস্থতায়, [10] সাইকো থেরাপি, [11] স্বাস্থ্যসেবা, [12] খাওয়ার সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সমাধান করার ক্ষেত্রে, [13] ন্যায়বিচারে, [14] [15] [16] এবং একটি শিশুদের বই রচনার ভিত্তি হিসাবে, [17] ব্যবহারসহ অন্যান্য বিষয়গুলিতে ব্যবহার করতে দেখা যায়।

রোজেনবার্গ রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কলম্বিয়া, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড এবং মধ্য প্রাচ্যের পশ্চিম তীর সহ বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি রক্ষার কর্মসূচিতে অহিংস যোগাযোগ তত্ত্বে ব্যবহার করেছেন।

ইতিহাস ও বিকাশ

সেন্টার ফর ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশনের (সিএনভিসি) ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে, রোজেনবার্গ [1] কার্যকর শান্তিরক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে অহিংস যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন। ১৯৬০-এর দশকের নাগরিক অধিকার কর্মী হিসেবে কাজ করার সময় এনভিসি বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি দাঙ্গাকারী শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসকদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিলেন।

মেরিয়ন লিটল (২০০৮) এর একটি মাস্টার্স থিসিস থেকে জানা যায়, এনভিসির মডেলের উন্নয়ন শুরু হয় ষাটের দশকের শেষ দিকে। যখন রোজেনবার্গ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন স্কুল ও সংস্থায় জাতিগত সংহত-করণের জন্য কাজ করছিলেন। [1] মডেলটির প্রথমত সংস্করণে পর্যবেক্ষণ, অনুভূতি ও কর্ম-ভিত্তিক চাহিদা সংযুক্ত ছিল। ১৯৭২ সালে রোজেনবার্গ একটি প্রশিক্ষণের ম্যানুয়াল হিসেবে এই মডেল তৈরি করেন। ১৯৯২ সালে মডেলটি তার বর্তমান রূপ লাভ করে। পর্যবেক্ষণ, অনুভূতির সঙ্গে প্রয়োজনীয়তা ও অনুরোধ বিষয়টি সংযুক্ত করা হয়।

রোজেনবার্গ ও এনভিসি চর্চাকারী প্রশিক্ষকরা পরবর্তী মডেলটিতে আরও পরিবর্তন আনেন। ২০০০ দশকের শেষ দিকে মডেলে কার্যকারিতার চাবিকাঠি হিসাবে আত্ম-সহানুভূতির উপর আরও জোর দেয়া হয়। ২০০০ সালের পরে মডেলটিকে প্রসেস বা ধাপ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। সেই সময়ে এনভিসি চর্চা কারীদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও বেশি জোর দেয়া হয়। বলার ক্ষেত্রে, অন্যরা যা চায় সেই কাজটি কি করার উদ্দেশ্য বোঝা, বা আরও অর্থবহ সম্পর্ক ও পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিপ্রায় কি তা জানার দিকে বেশি জোর দেয়া হয়। আর শোনার ক্ষেত্রে, একজন যা বলবে তা শোনার জন্য প্রস্তুত থাকার উদ্দেশ্য বোঝা, বা অন্যের প্রতি আন্তরিক, শ্রদ্ধাশীল মনোযোগ বাড়ানোর জন্য কি করা যায় তা বোঝা। এবং অন্যের সাথে সংযোগের গুণগত মান বিকাশে জোর দেয়া হয়।

লিটলের ভাষ্যে, রোজেনবার্গ এরিক ফ্রম, জর্জ আলবি এবং জর্জ মিলার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাদের প্রভাবেই ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি থেকে কমিউনিটি কেন্দ্রিক কাজে আগ্রহী হন রোজেনবার্গ। রোজেনবার্গের প্রভাবিত হওয়ার কারণের মধ্যে অন্যতম:

১. ব্যক্তি হিসেবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের মাত্রা নির্ভর করে সামাজিক কাঠামোর ওপর (ফ্রম)

২. থেরাপিস্টরা একাকী সমাজের মানসিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না (আলবি)

৩. মানুষের আচরণ সম্পর্কে জানার পরিধি বিকশিত হবে ততই যতই না সামাজিক কাঠামোতে মনোবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট হবে (মিলার).[1]

লিটলের মতে, রোজেনবার্গ অহিংসা যোগাযোগ ধারণার ভিত্তি হিসেবে মহাত্মা গান্ধীর জীবনাদর্শকে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেন। অহিংসা দর্শনের মাধ্যমে একটি প্রক্রিয়া তৈরির চেষ্টা করে রোজেনবার্গ। লিটলের ভাষ্যে, রোজেনবার্গ অহিংসাকে সেই উপচে পড়া ভালোবাসা হিসেবে মনে করতেন যার প্রভাবে হৃদয় থেকে যত অসুস্থতা, রাগ এবং ঘৃণা আছে সব কমে যাবে।”[1]

যোগাযোগের প্রকৃতি ও ভিন্নতা বোঝাতে রোজেনবার্গ দুটি প্রাণী উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। সহিংস যোগাযোগের জন্য তিনি মাংসাশী শেয়ালকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে আগ্রাসন বিষয়টি প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, তৃণভোজী জিরাফকে উপস্থাপন করেন। জিরাফের মাধ্যমে ভবিষ্যতমুখী বক্তাদের উদাহরণ দেয়া হয়, যে কিনা অন্যান্য বক্তাদের অভিব্যক্তি ও অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন। জিরাফ বিনয়ী ও দয়াশীল, যে কিনা এনভিসি তত্ত্বের সহানুভূতির দিকটি প্রকাশ করে। রোজেনবার্গ যোগাযোগের ভিন্নতা বোঝাতে প্রাণী অবয়ব ব্যবহার করেন। [1]

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

অহিংস যোগাযোগ ধারণা অনুসারে, ব্যক্তি বা দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার কারণে হচ্ছে তাদের চাহিদা সম্পর্কে না জানা, না বোঝা। ভাষা-গত পার্থক্যের কারণে ভয়, অপরাধ বোধ, লজ্জা, ইত্যাদি বিষয়গুলো জন্ম নেয়। এমন “হিংসাত্মক” যোগাযোগের পদ্ধতিগুলি সংঘাত বা দ্বন্দ্ব চলাকালীন সময়ে ব্যবহৃত হলে অংশগ্রহণকারীরা তাদের প্রয়োজনীয়তা, তাদের অনুভূতি, উপলব্ধি ও অনুরোধগুলি স্পষ্ট করার বদলে তাদের সংঘাতকে স্থায়ী করে তোলার দিকে মনোযোগ দেন।

অহিংস যোগাযোগের প্রতিষ্ঠাতা মার্শাল রোজেনবার্গ মৌলিক সামাজিক পরিবর্তন আনার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি করেন। [1] তিনি “জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা” নামের একটি পদ্ধতির মাধ্যমে “গ্যাং সংস্কৃতি ও আধিপত্য কাঠামো”-তে রূপান্তর করতে গুরুত্ব দেন। তার মতে, “জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা” করার মাধ্যমে সবার জীবনে পরিবর্তন আনা যায়। [2]

ধারণাসমূহ

দুজন এনভিসি প্রশিক্ষক এনভিসিসংশ্লিষ্ট ধারণা বা অনুমানগুলোকে নিম্ন-লিখিতভাবে প্রকাশ করেছেন:

  1. সকল মানুষ একই ধরণের চাহিদা অনুভব করে
  2. আমাদের পৃথিবী প্রত্যেকের প্রাথমিক চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত জিনিষপত্র সরবরাহ করতে পারে
  3. সমস্ত কাজের পেছনে চাহিদা মেটানোর প্রয়োজন থাকে।
  4. মানুষের অনুভূতিগুলো আসলে চাহিদা পূরণ করা বা অপূরণের সঙ্গে যুক্ত
  5. সবারই মমত্ববোধ ক্ষমতা রয়েছে
  6. মানুষ দান বিষয়টি উপভোগ করে
  7. মানুষ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল মানবিক সম্পর্কের মাধ্যমে নিজের চাহিদা পূরণ করে
  8. মানুষ বদলে যায়
  9. পছন্দ বিষয়টি অভ্যন্তরীণ
  10. শান্তি অর্জনের সরাসরি একটি পথ হচ্ছে আত্ম-সংযোগ বা সেলফ কানেকশন তৈরির মাধ্যমে

উদ্দেশ্য

এনভিসি প্রশিক্ষকরা আরও এনভিসি অনুশীলন করার সাথে নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যগুলি জড়িত:বলে মনে করেন:

খোলামেলা বা মুক্ত মনের জীবনযাপন

  1. স্ব-সমবেদনা বা সেলফ কমপ্যাশন
  2. হৃদয় থেকে প্রকাশ করা
  3. সহানুভূতি সংযুক্ত প্রাপ্তি
  4. সংযোগ বা সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া
  5. ঠিক-ভুল বিষয়কে ছাপিয়ে প্রয়োজন-ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবহার করার দিকে গুরুত্ব দেয়

পছন্দ, দায়িত্ব, শান্তি

  1. আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের অনুভূতির দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি
  2. আমাদের কর্মের জন্য আমরাই দায় গ্রহণ করছি
  3. চাহিদা পূরণ না করেও শান্তিতে বাস করা
  4. চাহিদা পূরণের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি করা
  5. বর্তমান মুহূর্তকে গ্রহণের জন্য ব্যক্তি সক্ষমতা বাড়ানো

ভাগ করে নেওয়ার শক্তি (অংশীদারিত্ব)

  1. সকলের প্রয়োজনের সমভাবে যত্ন নেওয়া
  2. অন্য কাউকে শাস্তি বা শিক্ষা দেয়ার বদলে ন্যূনতম বল প্রয়োগ করা ও সুরক্ষা করা; শর্তবিহীনভাবে যা চাই তাই পাওয়া

যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট যে বিষয় সমবেদনাকে বাধা দেয়

রোজেনবার্গ বলেছেন যে যোগাযোগের কিছু নির্দিষ্ট উপায় মানুষকে :ch.২ সমবেদনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়: [1] :ch.২

  • নৈতিকতা ভিত্তিক বিচার
  • চাহিদা বা দাবি
  • দায়িত্ব অস্বীকার
  • তুলনা করার প্রবণতা
  • যোগ্যতা ভিত্তিক প্রাপ্তি

চারটি উপাদান

পর্যবেক্ষণ : যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে অনুভূতি-কেন্দ্রিক বিষয়গুলোর (আমরা কি দেখছি, শ্রবণ করছি বা স্পর্শ করছি) সঙ্গে আমাদের বোঝার অর্থ ও গুরুত্ব বেশ ভিন্ন। এনভিসি তত্ত্ব অনুসারে যেকোনো ঘটনাকে সরলীকরণ বা সাধারণীকরণকে নিরুৎসাহিত করা হয়। বলা হয়ে থাকে, “যখন আমরা পর্যবেক্ষণকে আমাদের মূল্যায়নের সাথে একত্রিত করি তখন অন্যেরা সমালোচনা শুনতে ও আমরা যা বলছি তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত থাকে।” এই আচরণের পরিবর্তে, সময় ও প্রাসঙ্গিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণে ফোকাস দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। [1] :ch.৩

অনুভূতি : আবেগ বা সংবেদনকে আমাদের মানবিক চিন্তা ও ভাবনা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। যেমন, ‘আমি মনে করছি যে আমি ন্যায্য ভাগ পাইনি- এমন ভাবনা; কিছু শব্দ যা থেকে অনুভূতি বোঝায় (যেমন, “অপর্যাপ্ত”); আমরা যেভাবে অন্যরা আমাদের মূল্যায়ন করছে বলে মনে করে (যেমন, “গুরুত্বহীন”), বা অন্যরা আমাদের সাথে কি করছে তা নিয়ে আমরা যা মনে করি (যেমন, “ভুল বোঝাবুঝি”, “উপেক্ষা করা”) এড়িয়ে চলতে হবে। অনুভূতিগুলি প্রতিফলিত হয় আমরা যখন আমাদের প্রয়োজনগুলি পূরণ করি বা করতে পারি না তার উপর। অনুভূতি সনাক্তকরণের গুণ আমাদের আরও সহজে একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। :ch.৪

প্রয়োজন : মানুষের সার্বজনীন চাহিদা আর প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য থাকে। বলা হয়, “আমরা যা কিছু করি তা আমাদের প্রয়োজন থেকেই করি।”

অনুরোধ : চাহিদা ছাড়াই আমাদের সুনির্দিষ্ট কর্মের জন্য অনুরোধ করতে হবে। অনুরোধ আর দাবীর মধ্যে পার্থক্য আছে। অনুরোধের ক্ষেত্রে না শুনলে তখন প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া যাবে না। কেউ যদি কেউ অনুরোধ করে ও উত্তরে “না” শোনে তবে হাল না ছেড়ে দিয়ে কীভাবে কথোপকথনটি চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কেন অন্য ব্যক্তি “হ্যাঁ” বলছে না তা সহানুভূতি নিয়ে জানতে হবে। অনুরোধ করতে স্পষ্ট, ইতিবাচক, নির্দিষ্ট কাজ-সংশ্লিষ্ট ভাষা ব্যবহার করতে হবে। [1] :ch.৬

মাধ্যম

এনভিসি প্রয়োগের প্রধানত প্রাথমিক পদ্ধতি হচ্ছে তিনটি:

  • আত্ম-সহানুভূতি বা সেলফ এমপ্যাথি: যা আমাদের মন বা মননের ভেতরে যা চলছে তার সঙ্গে সহানুভূতি পূর্ণভাবে জড়িত হওয়ার বিষয়টি বোঝায়। এই ভাগটি আমাদের নিরপেক্ষভাবে চিন্তাভাবনা ও বিচারবুদ্ধিকে পর্যবেক্ষণ করা, আমাদের অনুভূতিগুলি লক্ষ্য করা এবং সবচেয়ে গুরুত্ব-পূর্ণভাবে আমাদের যে প্রয়োজনগুলো আছে তার সঙ্গে আমাদের সংযোগ স্থাপন করে। [1] :ch.৪
  • সহানুভূতিভিত্তিক প্রাপ্তি: এ বিষয়টি “অন্য ব্যক্তির মধ্যে যা আছে এবং কি কি কারণে তাদের জীবন সুন্দর করে তুলছে তার সম্পৃক্ততা বোঝায়। এ বিষয়টি শুধুমাত্র অন্য ব্যক্তি কি বলছে তা মানসিকভাবে বুঝতে পারাকে বোঝায় না, সহানুভূতি বা এম্পেথেটিক সংযোগ আমাদের হৃদয়সংশ্লিষ্ট গুণকে বোঝায়। যা অন্য ব্যক্তির মধ্যে সৌন্দর্য দেখতে, অন্য ব্যক্তির মধ্যে ঐশ্বরিক শক্তি, তাদের মধ্যে যে জীবন্ত বিষয়টি আছে তা বুঝতে সহায়তা করে।”” [1] :ch.৫ সহানুভূতি “মনকে ফাঁকা করে আমাদেরকে নিজেদের শুনতে” কাজ করে। এনভিসি তত্ত্বে বলা হয়, অন্য ব্যক্তি নিজেকে যেভাবেই প্রকাশ করুক না কেন ব্যক্তি হিসেবে আমাদের অন্তর্নিহিত পর্যবেক্ষণ, অনুভূতি, প্রয়োজনীয়তা এবং অনুরোধগুলি শোনার দিকে বেশি বেশি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। [2] :ch.৭
  • সততার সাথে প্রকাশ করা: কোনও পর্যবেক্ষণ, অনুভূতি, প্রয়োজন এবং অনুরোধ বিষয়টিকে এনভিসি সততার সঙ্গে প্রকাশের কথা বলে।

আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পর্ক

থেরেসা লাটিনির ভাষ্যে, “রোজেনবার্গ এনভিসি বিষয়টিকে মৌলিকভাবে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ভাবতেন।”[1] মার্শাল রোজেনবার্গ এনভিসি তত্ত্বের ওপর তার নিজের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রভাব ছিল বলে জানান।

আমি মনে করি এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষ আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে অহিংস যোগাযোগের সূত্র খুঁজে পায়। এই যোগাযোগের কৌশল তারা মানসিক প্রক্রিয়ায় শেখার সুযোগ পায়। এটা সত্যিই একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন যা আমি জীবনে বেঁচে থাকার একটি উপায় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছি। আমরা উল্লেখ না করলেও মানুষ অহিংসা যোগাযোগের দ্বারা বিমোহিত হতে অনুশীলন করে।.[1]

রোজেনবার্গের এনভিসি তৈরির পেছনে অন্যতম কারণ ছিল “সচেতন হওয়ার ক্ষেত্র” বিষয়টি যা কিনা তিনি “বিলাভড ডিভাইন এনার্জি” বা “স্নেহের ঐশ্বরিক শক্তি” হিসেবে বলতেন।[1]

অনেক খ্রিস্টান ধর্মালম্বী এনভিসি তত্ত্বকে তাদের খ্রিস্টান বিশ্বাসের.[1][2][3][4][5] সঙ্গে তুলনা করেন। আবার, অহিংস যোগাযোগ , বৌদ্ধ ধর্ম সম্পৃক্ত বলে অনেকেই এনভিসি তত্ত্বকে বৌদ্ধ আদর্শের অনুশীলন.[6][7][8] হিসেবে তুলনা করেন।

সংগঠন

মার্শাল রোজেনবার্গ অহিংস যোগাযোগকেন্দ্রিক এনভিসি, অহিংস যোগাযোগ ও সহমর্মী যোগাযোগসহ বেশ কিছু শব্দের ট্রেডমার্কের অধিকারী। রোজেনবার্গ দ্য সেন্টার ফর ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশ প্রতিষ্ঠা করেন। .[1]

তথ্যসূত্র:

  1.  “The Center for Collaborative Communication”. Retrieved Nov 11, 2011.
  2. Jump up to:a b Jane Branscomb (2011), Summation Evaluation of a Workshop in Collaborative Communication Archived2015-09-23 at the Wayback Machine, M.A. Thesis, Rollins School of Public Health of Emory University.
  3. ^ Gates, Bob; Gear, Jane; Wray, Jane (2000). Behavioural Distress: Concepts & Strategies. Bailliere Tindall.
  4. Jump up to:a b c Inbal Kashtan, Miki Kashtan, Key Assumptions and Intentions of NVC, BayNVC.org
  5. Jump up to:a b Fullerton, Elaine (February 2009). “The development of “Nonviolent Communication” in an early years setting to support conflict resolution and develop an emotional intelligence related to both self and others”Behaviour4Learning. GTC Scotland. Retrieved Sep 22, 2011.[permanent dead link]
  6. ^ Miyashiro, Marie R. (2011). The Empathy Factor: Your Competitive Advantage for Personal, Team, and Business Success. Puddledancer Press. p. 256. ISBN 978-1-892005-25-0.
  7. ^ Lasater, Ike; Julie Stiles (2010). Words That Work In Business: A Practical Guide to Effective Communication in the Workplace. Puddledancer Press. p. 160. ISBN 978-1-892005-01-4.
  8. ^ Hart, Sura; Victoria Kindle Hodson (2006). Respectful Parents, Respectful Kids: 7 Keys to Turn Family Conflict into Cooperation. Puddledancer Press. p. 208. ISBN 1-892005-22-0.
-- Stay cool. Embrace weird.
Total 529 views. Thank You for caring my happiness.

Comments

comments