স্টিভ জবসের সেই ইন্টারভিউ, পর্ব এক

নেক্সট কম্পিউটরের সিইও হিসেবে ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে কম্পিউটারওয়ার্ল্ডকে দারুণ এক ইন্টারভিউ দেন স্টিভ জবস। কম্পিউটারওয়ার্ল্ড অনার্স অ্যাওয়ার্ডস প্রোগ্রামের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর স্টিভ জবসের সেই বিখ্যাত ইন্টারভিউ নেন ড্যানিয়েল মোরো।

সেই ইন্টারভিউয়ের বাংলা অনুবাদের জন্যই এই পোস্টখানা!

ড্যানিয়েল: স্টিভ, আমি শুরু করতে চাই আপনার বায়োগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন নিয়ে। আপনার সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

জবস: ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী নামের গ্রহের যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ফ্রান্সিসকোতে আমি জন্মেছিলাম। আমার তারুণ্যের অনেক কথাই আমি বলতে পারি, কিন্তু আমি জানি না সেই কথা শুনে অন্য কারও কিছু হবে কিনা।

ড্যানিয়েল: ওয়েল, তা হতে বোধ হয় তিনশ বছর লেগে যাবে কারণ এই (ইন্টারভিউয়ের) প্রিন্ট ছড়িয়ে দিতে অনেক সময় লেগে যাবে। আমাকে আপনার বাবা-মা, ফ্যামিলি সম্পর্কে কিছু জানান না। আপনার একেবারে ছোটবেলার কোন ঘটনা মনে আছে? ১৯৫৫ সালে তো আইজেনআওয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

জবস: আমার অবশ্য তার কথা মনে নেই। আমার কিন্তু পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে বেড়ে ওঠার কথা মনে আছে। সেই সময়টা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দারুণ একটা সময় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সেই সময়টাতে প্রায় সবক্ষেত্রেই আমেরিকা সাফল্যের শীর্ষে পৌছে গিয়েছিল। চুলের ছাঁট থেকে শুরু করে সংস্কৃতি সব কিছুই ছিল স্ট্রেট আর ন্যারো টাইপের। এসব কারণেই ষাটের দশকে নতুন দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সবকিছুতে টাটকা সাফল্য ছিল। একেবারে তরুণ। আমার তখনকার যত কথা মনে আছে তাতে আমেরিকাকে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি তরুণ ও প্রানবন্ত-সাদাসিধে।

ড্যানিয়েল: তো, জন কেনেডি আততায়ীর হাতে নিহত হন তখন আপনার বয়স পাঁচ বা ছয়?

জবস: আমার জন কেনেডি নিহত হওয়ার কথা মনে আছে। যখন তার হত্যাকান্ডের খবর শুনেছিলাম, সেই সময়টাও আমার মনে আছে।

ড্যানিয়েল: তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

জবস: দুপুর বেলাতে আমি স্কুল প্রাঙনের ঘাসের উদ্যানটি হেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, তখন কে জানি রাষ্ট্রপতিকে গুলি করা হয়েছে এবং মারা গেছে বলে চিৎকার করছিল। আমার মনে হয় তখন আমার সাত বা আটবছর বয়স হবে, আমি জানতাম সেই চিৎকারের অর্থ কি। আমার কিউবার মিসাইল সংকটের কথাও মনে আছে। আমি মনে হয় তিন বা চাররাত ঘুমাতে পারছিলাম না ভয়ে। আমার ভয় হচ্ছিল, আমি যদি ঘুমিয়ে যাই আর না ওটতে পারি। আমার মনে হয় সে সময় আমার বয়স সাত, আমি বুঝতে পারছিলাম কি হচ্ছিল তখন। আমার মনে হয় সবাই পারছিল। সেই সময়টা আসলেই ভয়ের ছিল, আমি আসলেই কখনই তা ভুলতে পারবো না; ভোলা যাবে না। আমার মনে হয় তখনকার সবাই এ ভয়টা পেয়েছিল।

ড্যানিয়েল: আমরা যারা বয়ষ্ক তাদের মনে আছে, তখন দেশ ধ্বংম গয়ে গেলে আমরা কোথায় থাকবো তা বের করার প্ল্যান করেছিলাম। বরই অদ্ভুত এক সময় চলছিল। একটা বিষয় হলো, আমরা প্যাশন আর পাওয়ারকে নির্ভর করে কিছু একটা ধরার চেষ্টা করছিলাম। আপনার শুরুর দিকে কোন বিষয়গুলোতে আপনার আগ্রহ ছিল, কিংবা কি আপনাকে বেশি টানতো?

জবস: আমি খুব সৌভাগ্যবান ছিলাম। আমার বাবা পল, দারুণ এক মানুষ ছিলেন। সে কোন দিন হাই স্কুল পাশ করেন নি। তিনি কোস্ট গার্ডে যোগ দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সৈন্যদের সঙ্গে সারা পৃথিবী ছুটে বেড়িয়েছেন। আমার মনে হয়, তিনি সব সময়ই অনেক সমস্যায় পড়তেন আর নিজে নিজে তাতে ডুবে যেতেন।

তিনি আসলে একজন মেশিনিস্ট ছিলেন। ভীষণ পরিশ্রম করার কারণে নিজের দুনিয়াতে দারুণ প্রতিভাবান ছিলেন তিনি। তার গ্যারেজে একটা ওয়ার্কবেঞ্চ ছিল। আমার বয়স যখন পাঁচ বা ছয় তখন তিনি সেই গ্যারেজের ওয়ার্কবেঞ্চের একটা অংশ আলাদা করে আমাকে বলেছিলেন, ‘স্টিভ, এটা তোমার ওয়ার্কবেঞ্চ এখন।’ সেই সঙ্গে তিনি আমাকে কিছু ছোটখাটো টুলস দিয়েছিলেন। তিনি হাতুড়ী আর করাত কিভাবে কাজ করে, তা দিয়ে কিভাবে জিনিষ তৈরি করা যায় আমাকে হাতে ধরে শিখিয়ে ছিলেন। তিনি আমার সঙ্গে অনেক সময় কাটাতেন…..আমাকে শেখাতেন কিভাবে জিনিষ তৈরি করতে হয়, কিভাবে জিনিষকে টুকরো করতে হয়, কিভাবে টুকরো জিনিষকে এক করা যায়।

অনেকগুলো জিনিষের মধ্যে তিনি ইলেকট্রনিক্স নিয়ে ঘাটাঘাটি করতেন। তার আসলে ইলেকট্রনিক্স নিয়ে তেমন জ্ঞান ছিল না, কিন্তু অটোমোবাইল ঘাটাঘাটি করার সময় ইলেকট্রনিক্স নিয়ে ঘাটাঘাটি করতেন তিনি। তিনি আমাকে ইলেকট্রনিক্সের শুরুর দিককার জ্ঞান দিয়েছিলেন, আমার কিন্তু তাতে দারুণ আগ্রহ জন্মেছিল।

নব্বই দশকে ব্যবসা দুনিয়াতে একরোখা হিসেবে দারুণ ভাবে পরিচিত ছিল স্টিভ জবস। ছবি: সংগৃহীত।

আমি বড় হয়েছি সিলিকন ভ্যালিতে। আমার বয়স যখন পাঁচ তখন আমার বাবা-মা স্যান ফ্র্যান্সিসকো থেকে মাউন্টেন ভিউতে চলে আসে। আমার বাবার বদলি হয়েছিল তখন। একেবারে সিলিকন ভ্যালির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছিলাম আমরা, যেখানে চারপাশে প্রকৌশলীই দেখতাম খালি।
সে সময়টায় সিলিকন ভ্যালির বেশির ভাগ এলাকাতে ছিল ফলের বাগান–রাশস্পবেরি বাগান আর খেজুরের বাগান–এবং সেটা ছিল সত্যিকারের স্বর্গ। আমার মনে আছে, তখন বাতাস ছিল ক্রিস্টালের মত স্বচ্ছ, যা দিয়ে আপনি পুরো উপত্যাকার এক অংশ থেকে অন্যপাশের শেষ অংশ দেখতে পারতেন।
ড্যানিয়েল: এটা তো আপনার যখন ছয়, সাত আর আট বছর সেই সময়টা।
জবস: হ্যা। এটাই। এটা ছিল পৃথিবীতে বেড়ে ওঠার সবচেয়ে দারুণ জায়গা। সে সময় রাস্তার শেষ দিকে নতুন এক লোক তার স্ত্রীকে নিয়ে এসে থাকা শুরু করেন, মনে হয় ছয় বা সাত বাড়ি দুরেই। পরে জেনেছিলাম, তিনি ছিলেন হিউলেট-প্যাকার্ডের একজন প্রকৌশলী, হ্যাম রেডিও অপারেটও ছিলেন তিনি। পুরোপুরি প্রকৌশলী। তিনি এলাকার শিশুদের চিনতে বেশ অদ্ভুতই এক কাজ করতেন। তিনি একটা কার্বন মাইক্রোফোন আর একটা ব্যাটারি ও স্পিকার তার ড্রাইভওয়েতে রেখে দিতেন; যার মাইক্রোফোন দিয়ে আপনি কথা কথা বললে স্পিকার দিয়ে আপনার কথা অ্যামপ্লিফাইড হয়ে যেত। প্রতিবেশিদের জানার জন্য এটা বেশ অদ্ভুতই একটা বিষয়, আর এটাই তিনি করতেন।

Steve-Jobs-Apple-image

ড্যানিয়েল: দারুণ তো।

জবস: আমিও তার চারপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করে দিয়েছিলাম। আমি সব সময় শিখেছিলাম, আপনার একটা অ্যামপ্লিফায়ার প্রয়োজন হবে মাইক্রোফোনে শব্দকে অ্যামপ্লিফাই করার জন্য। আমার বাবাই এটা আমাকে শিখিয়েছিলেন। আমি খুব করে বাড়িতে বাবার কাছে গিয়ে বলেছিলাম তিনি ভুল, রাস্তার শেষে বাড়ির লোকটা তো ব্যাটারি দিয়েই শব্দ অ্যামপ্লিফাই করতে পারেন। আমার বাবা আমি কিছু জানি বলে আমাকে বলছিলেন, আমরা অনেক জোরে-সরে তর্ক করছিলাম। আমি তাকে টেনে নিয়ে সেখানে যাই, আর তাকে কিছুটা হলেও হতভম্ব করে দিয়েছিলাম।

আমি সেই লোকের পরিচয় জেনেছিলাম, তার নাম ল্যারি ল্যাং, তার কাছেই আমি ইলেকট্রনিক্স সম্পর্কে জেনেছিলাম। তিনি দারুণ ছিলেন। তিনি হিথকিটস তৈরি করতেন। (হিথকিটসে ইলেকট্রনিক জিনিষপত্র আর কিটস আলাদা-আলাদা থাকে, অনেকটা লেগোর মত; এখন যেমন সিপিইউ কিনে আমরা সব জোড়াতালি দেই তেমন।) হিথকিটস কিন্তু দারুণ ছিল। হিথকিটস ছিল সেই পন্যগুলো যা আপনাকে কিট আকারে কিনতে হত। আপনি যদি পুরো একটা ফিনিশড প্রোডাক্ট কিনতেন তাহলে আপনাকে আসলে বেশি টাকা দিতে হত। হিথকিটসে সব কিছু আলাদা-আলাদা থাকতো আর পূর্ণাঙ্গ ম্যানুয়েলসহ। সবগুলো অংশ আলাদা-আলাদা থাকতো আর কালার কোডেড ছিল। আপনি আসলে সেগুলো নিজের জন্যই তৈরি করতেন।

পলের কোলে স্টিভ জবস। ছবি: সংগৃহীত।

আমি এই বিষয়ে একটি কথা বলতে চাই, এরমাধ্যমে আপনি অনেক জিনিষ নিয়ে একটি জিনিষ তৈরি করতেন। এর মাধ্যমে আপনি কিভাবে ফিনিশড প্রোডাক্টের ভিতরে কি থাকে তা জানতে পারছেন, তা কিভাবে কাজ করে তাও জেনে যাবেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এটা আপনাকে এমন একটা অনুভূতি দেবে যেন মনে হয় আপনি আপনার চারপাশের দুনিয়া কিভাবে গড়ে উঠছে তা দেখতে পারছেন। রহস্য কিন্তু এখানেই শেষ ছিল। আমি বলতে চাই, আপনি টেলিভিশন সেট দেখে ভেবেছেন কি, ‘আমি তো এটা তৈরি করিনি, কিন্তু আমি পারি। হিথকিটের ক্যাটালগে এমনই কিছু একটা ছিল আর আমি তো আরও দুটো হিথকিটস দিয়ে তৈরি করেছি, আর তাই আমি পারবো সেটা তৈরি করতে।’

বিষয়টা অনেকটা এমনই পরিষ্কার ছিল যে মানুষই যেন তা তৈরি করছে। এটা জাদুর মত কিছু না যে এমনি তৈরি হয়ে যাচ্ছে, কোন ধারণা ছাড়াই যেন জিনিষটা তৈরি হচ্ছে। এই জোড়া-তালির বিষয়টা দারুণ আত্মবিশ্বাস জন্ম দেয় কিন্তু। যে কেউ কিন্তু আসলে জানার আগ্রহ আর শেখার আগ্রহ থেকে চারপাশের কঠিন সব বিষয় সম্পর্কেই জানতে পারে। আমার শৈশবটা আসলে এসব নিয়েই দারুণ ছিল।

(চলবে)

 

আরও পড়ুন:

সোফারও একটা উদ্দেশ্য থাকে-স্টিভ জবস।

Hi! Myself Aashaa Zahid.
Basically, I’m a Transporter of Happiness. An average son of a great parent. An average man.
You could knock me, text me, ping me for nothing!
-- Stay cool. Embrace weird.
Total 1,565 views. Thank You for caring my happiness.

Comments

comments

Aashaa Zahid

Hi! Myself Aashaa Zahid. Basically, I'm a Transporter of Happiness. An average son of a great parent. An average man. You could knock me, text me, ping me for nothing!

One thought on “স্টিভ জবসের সেই ইন্টারভিউ, পর্ব এক

Leave a Reply